রাজশাহীর চারঘাট এলাকায় বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে সংঘটিত ঘটনার জেরে দু’দেশে দু’টি মামলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী,ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পক্ষ থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আর বিজিবি’র পক্ষ থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশের ভেতরে অনুপ্রবেশ ও সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ ধরার অভিযোগে মামলা করা হয়।

এ ঘটনায় বাংলাদেশের হাতে একজন ভারতীয় নাগরিক আটক হলেও ভারতের হাতে কোনও বাংলাদেশি নাগরিক আটক নেই। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আইনজীবীরা বলছেন,সীমান্ত সংশ্লিষ্ট ঘটনায় সাধারণত দু’দেশেই মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়ে  থাকে। আসামি আটক  থাকলে এসব মামলার কার্যকারিতা থাকে একরকম, আর না থাকলে আরেক রকম হয়। তবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কিংবা আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলে এসব ঘটনার সুরাহাও ঠিক সেভাবেই হয়ে থাকে।
এই মামলার পরিণতি বা আইনি বিষয়ে জানতে চাইলে সামরিক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেমন ফেলানী হত্যা ঘটনার পর আমরা মামলা করেছিলাম। সেটা এখনও ভারতের উচ্চ আদালতে বিচারাধীন আছে। কারও নাগরিক সীমান্তে হত্যার শিকার হলে নিশ্চয়ই তার বিচার হবে। তবে ভারতীয় এলাকায় কোনও বাংলাদেশি নাগরিক মারা গেলে ও  মামলা করলে সেটা এত স্ট্রং হবে না।  আর এসব ক্ষেত্রে সাধারণত কেউ মামলাও করতে চায় না।’  ‘ তিনি বলেন, ‘রাজশাহীর চারঘাটের ঘটনায় যেহেতু বিএসএফের একজন সদস্য মারা গেছেন, সেখানে তাদের এলাকায় একটা মামলা করতেই হবে। কারণ, সেখানে নিহত ব্যক্তির পাওনার বিষয় আছে। চাকরির ক্ষেত্রে তিনি কী সুবিধা পাবেন, কী পাবেন না,ইন্সুরেনস পাবেন কী পাবেন না— এসব বিষয় জড়িত থাকে। মূলত ঘটনাটা ভুল বুঝাবুঝি থেকে হয়েছে। আমাদের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন। এটা একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। আমার মনে হয় না এটা নিয়ে আর কোনও পক্ষ আগাবে। কারণ, বিএসএফের উচিত হয়নি এভাবে চলে আসা। ভারতের কেউ যদি এখানে অ্যারেস্টও হয়, সেটা পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত ছিল। জোর করে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নাই। ’

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন,‘এটা একেবারেই নিচের পর্যায়ে হয়েছে। বিজিবি কিংবা বিএসএফের কোনও অফিসার এখানে জড়িত ছিলেন না। কাজেই আমার মনে হয় না এতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও প্রভাব পড়বে। আর এখানে যেই ভারতীয় নাগরিককে আটক করা হয়েছে, তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর অর্থই হচ্ছে আমাদের এখানেও এ ঘটনা নিয়ে একটা মামলা হয়েছে।’

একই বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলার আইনগত বিষয়গুলো আইনজ্ঞরাই বলতে পারবেন। আইন আইনের মতোই চলবে। আমরা যেটা বলতে পারি, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে যে সুসম্পর্ক রয়েছে, তাতে রাজশাহীর ঘটনায় কোনও প্রভাব পড়বে না। দু’দেশের মধ্যে টানাপড়েনেরও কোনও সুযোগ নেই। এটা হচ্ছে, তৃণমূলে যারা কাজ করেন, তাদের মধ্যে অনেক সময় ভুল বুঝাবুঝি হয়। সীমান্তে চোরাচালানসহ অনেক রকম অপরাধ সংঘটিত হয়। আর এসব অপরাধের সঙ্গে কোনও কোনও ক্ষেত্রে সীমান্ত বাহিনীর লোকজনও জড়িত থাকে। যে কারণেই এ ঘটনা হোক, এটা নিয়ে বিজিবি-বিএসএফসহ সংশ্লিষ্ট সব পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। ডিজি পর্যায়ে কথা হয়েছে। এখানে বাড়াবাড়ির সুযোগ নেই। এটি একেবারেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে কী কারণে ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে সেটা অন্য বিষয়।’
এক দেশের নাগরিকের বিরুদ্ধে আরেক দেশে দায়ের করা হত্যা মামলার ক্ষেত্রে আইন কী বলে, জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভারতের আইনে একজন বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে তাদের থানায় কিংবা আদালতে মামলা হতেই পারে। আমাদের দেশেও যদি বিদেশি কোনও নাগরিক অপরাধ করেন, তাহলে আমাদের দেশের আইনেই বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে বিচার চলবে। একইভাবে ভারতের আইনেও তাই আছে। ফলে কারও বিরুদ্ধে তার দেশের প্রচলিত আইনে মামলা বা বিচার তারা করতেই পারে।  বাংলাদেশি কোনও নাগরিকের বিরুদ্ধে যদি ভারতের কোনও থানায় বা আদালতে মামলা হয়, সেক্ষেত্রে সেদেশে গিয়ে আমাদের দেশের কোনও নাগরিকের পক্ষে মামলায় ডিফেন্ড করার আইনগত কোনও সুযোগ নেই।’
এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘তাদের দেশে যদি আমাদের দেশের কোনও নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিতও হয়, সেক্ষেত্রে বন্দি বিনিময় হতে পারে। সেটা একান্তই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বিষয়। কোনও একটা দেশ যদি আমাদের বিরুদ্ধে এক তরফা মামলা চালায়, তাহলে কথা বলারতো আইনগত সুযোগ নেই। আমিতো সেখানে যেতে পারছি না। কোনও ডিফেন্স নিতে পারছি না। সেক্ষেত্রে  তারা যদি বলে যে— আমাদের কোনও নাগরিক সেখানে গিয়েছিলেন, গিয়ে অপরাধ সংঘটিত করেছেন, সেটাও প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়। একইভাবে আমাদের দেশেও যদি ভারতের কোনও নাগরিক এসে অপরাধ করেন। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশেও সেই নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। কিন্তু রাজশাহীর চারঘাট এলাকায় বিজিবি-বিএসএফের  মধ্যে সংঘটিত ঘটনাতে আমরা মনে করি, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ একটা মিথ্যা মামলা করেছে। তারা আমাদের দেশের সীমানায় এসে অন্যায়ভাবে মাছ চুরি করেছিল বিএসএফের  প্রত্যক্ষ মদতে। আর দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে বিজিবি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সেটা প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে। এতে বিজিবি কোনও অন্যায় করেনি। ঘটনাটা আমাদের দেশের সীমানায় ঘটেছে। ভারতের সীমানায় কোনও ঘটনা ঘটেনি। আর তাদের মামলায় কী হলো, না হলো, সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। তাদের মামলার সাজা প্রয়োগ করারও সুযোগ নাই। যতক্ষণ ওই নাগরিক ভারতে গিয়ে আটক না হবেন।’
একই বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সুপিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম সরদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সীমান্ত সংশ্লিষ্ট ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো যার যার মতো মামলা বা সাধারণ ডায়েরি করে।  রাজশাহীর চারঘাটের মতো ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে সুবিধা নিতে চাইলে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করতে হবে। আর আমাদের কেউ যদি ভারতীয়দের হাতে অ্যারেস্ট হয়, তাহলে হবে একরকম। আর না হলে হবে আরেক রকম। তাদের মামলা বিচার করে তাদের সরকারের কাছে বলবে।’

তিনি বলেন,‘ভারতের সঙ্গে আমাদের একটা চুক্তি আছে জানি যে, তাদের দেশের কোনও আসামি যদি আমাদের দেশে থাকে, তাহলে আমরা হস্তান্তর করবো। আর আমাদের দেশের কোনও আসামি বা সন্ত্রাসী তাদের দেশে থাকলে, তারা হস্তান্তর করবে। কিন্তু আমাদের দেশের কোনও লোক তাদের মামলার আসামি হলে তাকে হস্তান্তর করতে হবে— সেরকম কোনও চুক্তি নাই।  রাষ্ট্র সেটা পারবে না। রাষ্ট্র তার নাগরিককে অন্য কোনও রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে পারবে না। এটা তার মৌলিক অধিকার। কোনও নাগরিককে অন্য কোনও রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার বিধান আমাদের আইনে নাই।’